ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ , ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এত মধু চট্রগ্রাম ফায়ার সার্ভিসে, চেটে খাচ্ছে সহকারী পরিচালক!

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৭-১০-২০২৬ ০২:০৬:৪১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৭-১০-২০২৬ ০২:০৬:৪১ অপরাহ্ন
এত মধু চট্রগ্রাম ফায়ার সার্ভিসে, চেটে খাচ্ছে সহকারী পরিচালক!



যেকোনো দুর্যোগ কিংবা দুর্ঘটনায় সবার আগে পাশে দাঁড়ায় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর। দুর্ঘটনা যত বড়ই হোক জীবন বাজি রেখে লড়াই করে যান অগ্নিসেনারা। কিন্তু অন্যের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রাখা এই বাহিনীতে ঘাপটি মেরে বসেছে কিছু অসাধু বড় দুর্নীতিবাজ।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক (এডি) মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, লাইসেন্স বাণিজ্য, বদলি-পোস্টিংয়ে আর্থিক লেনদেন, সরকারি মালামাল বিক্রি, রেশন সরবরাহ এবং বিল পরিশোধে কমিশন দাবিসহ ১৩টি সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এসব অভিযোগ নিয়ে ইতিপূর্বে একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে বারবার অভিযোগ ওঠার পরও তিনি জবাবদিহির আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের নবাগত মহাপরিচালকের জরুরি হস্তক্ষেপ এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ।

জানা যায়, তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া চট্টগ্রামে যোগদানের পর থেকেই একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, ফায়ার লাইসেন্স রি-অ্যাসেসমেন্ট বা নবায়ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন, ফায়ার সার্ভিসের নষ্ট ও অকেজো সরকারি মালামাল প্রচলিত সরকারি নিয়ম ও নীতিমালা অনুযায়ী নিলামে না তুলে গোপনে বাহিরে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাত করে যাচ্ছেন।

আরও জানা যায়, চরম বেপরোয়া এই কর্মকর্তা নিজের ছোট ভাই শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে ফায়ার সার্ভিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের সমস্ত ইন্সপেক্টরদের তার ভাইয়ের কাছে জিম্মি করে রেখেছেন। টাকার বিনিময়ে তিনি অগ্নি নিরাপত্তার মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এবং কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করে মোট ৪৫২টি ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ইস্যু করেছেন।

বদলি ও পোস্টিং বাণিজ্যের জাল

অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগে কাঙ্ক্ষিত পোস্টিং নিতে তিনি তৎকালীন ডিজির স্টাফ অফিসার (উপপরিচালক) আরমানকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ প্রদান করেছিলেন। একইভাবে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির সুপারিশের ক্ষেত্রেও তার স্বাক্ষর বা সুপারিশ পেতে নির্দিষ্ট অংকের অর্থ প্রদান করতে হয়, টাকা না দিলে তিনি ফাইল আটকে রাখেন এবং বদলির সুপারিশ করেন না বলে জানা গেছে।

এর আগে সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে চলতি বছরের ২০২৬ সালের মে-জুনে তিনি ইন্সপেক্টরদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।

টেন্ডারে অনিয়ম, কেনাকাটায় দুর্নীতির চিত্র

চট্টগ্রাম বিভাগের ই-জিপি টেন্ডারের মাধ্যমে রেশনের জন্য সরবরাহকৃত নিম্নমানের ডাল তার দপ্তরের ইউডি হাশেমের মাধ্যমে চাক্তাই থেকে ক্রয় করে শহরের বাইরের বিভিন্ন স্টেশনে সরবরাহ করা হয়। এ নিয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া জানালে তিনি তাদের বদলির ভয় দেখিয়ে হুঙ্কার দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, এছাড়া বিগত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বিভাগের ১০৫টি ফায়ার স্টেশনের বিভাগীয় কারিগরি কারখানায় বিভিন্ন গাড়ি ও পাম্পের মেরামতের বকেয়া বিল পরিশোধ না করে নিজের ইচ্ছেমতো নতুন বিল তৈরি করে সরকারি টাকা আত্মসাত করেছেন মিলেমিশে। অগ্রিম ১৫% কমিশন নির্ধারিত, কারণ এই টাকার ভাগ নাকি ঢাকা অধিদপ্তরেরও পৌঁছাতে হয়, অন্যথায় বিল পরিশোধে অনীহা প্রকাশ করেন তিনি।

দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতির মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেও

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেবাপ্রার্থী জানান, সম্প্রতি কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের ইনানী টুপ টুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এর ঠিক পূর্বে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি (রহিম ও কামাল) লাইসেন্সের জন্য এডি তৌফিকুলের সাথে দেখা করে ফায়ার সেফটি বা অগ্নি নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরামর্শ চান। ওই প্রতিষ্ঠানে বসে তিনি খাওয়া-দাওয়াও করেন এবং পরবর্তীতে তার দপ্তরের রানারের সাথে কথা বলতে বলেন।

তার নির্দেশমতো রানার লাইসেন্স বাবদ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করায় প্রতিষ্ঠানটি লাইসেন্স করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। পরবর্তী সময়ে এই অবহেলা ও দুর্নীতির কারণে সংঘটিত আগুনে ১০টি তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যায়।

এর আগে কুমিল্লায় কর্মরত থাকার সময় তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর এপিএস কামাল তার ঘনিষ্ট বন্ধু হওয়ার সুবাদে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে মনোহরগঞ্জ নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণকাজে অত্যন্ত নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ করেন। তাছাড়া কুমিল্লা ফায়ার স্টেশন মসজিদ নির্মাণের সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নগদ টাকা, রড, সিমেন্ট, বালি, ফ্যান ও টাইলস সংগ্রহ করা হলেও সেই নির্মাণসামগ্রী ও নগদ অর্থের একটি বড় অংশ তিনি নিজের বাড়িতে নিয়ে যান বলে জানা গেছে।

এসব চাঞ্চল্যকর অনিয়ম-দুর্নীতি ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে এডি মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল কেটে দেন।

উল্লেখ্য—ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের অনুমোদিত পদ সংখ্যা ১৪ হাজার ৫৭০ জন। বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৩ হাজার ৬৩৫ জন। শূন্য পদ সংখ্যা ৯৩৫ জন। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির (গ্রেড ১ থেকে ৯ পর্যন্ত) অনুমোদিত ৭১ জনের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪০ জন। দ্বিতীয় শ্রেণির (গ্রেড ১০ থেকে ১২) অনুমোদিত ১ হাজার ১৫১ জনের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৬৫৫ জন।

তৃতীয় শ্রেণি (গ্রেড ১৩ থেকে ১৬) পদে অনুমোদিত ৪ হাজার ২০৭ জনের বিপরীতে আছেন ৪ হাজার ৩ জন। চতুর্থ শ্রেণি (গ্রেড ১৭ থেকে ২০) পদে অনুমোদিত ৯ হাজার ১৪১ জনবলের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৮ হাজার ৯৩৭ জন। খালি চোখে ৯৩৫ জন শূন্য পদকে তেমন কিছুই মনে না হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোই শূন্য রাখা হয়েছে। এতে করে ফায়ার সার্ভিসের অপারেশনাল কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি—চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের নির্যাতিত ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের নবাগত মহাপরিচালকের জোরালো পদক্ষেপ আশা করেছেন।


নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ